গাড়ি ও ড্রোন হামলার পরিকল্পনায় জঙ্গিরা

টাঙ্গাইলের কালিহাতী থেকে ড্রোনসহ গ্রেফতার দুই সহোদরের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে রাজধানীর দারুসসালাম থানার ‘কমল প্রভা’য় ভয়ঙ্কর জঙ্গি আস্তানার সন্ধানের পর জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নতুন করে গতি এসেছে। জঙ্গিবিরোধী অভিযান সংশ্লিষ্টদের ভাবনায় এসেছে নতুন মাত্রা।

এরই মধ্যে শুরু হয়েছে জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। এসেছে সাফল্যও। রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকা থেকে পৃথক অভিযানে নব্য জেএমবির দুই সদস্য ও মোহাম্মদপুর থেকে একজন হিযবুত তাহরীর সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-পুলিশ। নব্য জেএমবির কাছ থেকে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন তাদের গাড়ি হামলার পরিকল্পনা ছিল। যদিও অতি সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিন জঙ্গি নিহত হওয়ার পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল জঙ্গিদের বড় ধরনের হামলার সামর্থ্য নেই। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তাদের ধারণা, নিহত তিনজন শীর্ষ জঙ্গি ছোট মিজান, বাশারুজ্জামান চকলেট ও মোশারফ। জানা গেছে, গত শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সদস্যরা নাঈম আহমেদ ওরফে আনাস ওরফে আবু হামজা ওরফে আরিশা কুনিয়া এবং আনোয়ার হোসেনকে ৩০টি ডেটোনেটর ও উগ্রবাদী মতাদর্শের কিছু বইসহ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা ইউরোপের আদলে এদেশে গাড়ি হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল বলে দাবি পুলিশের। গতকাল দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকা থেকে নব্য জেএমবির দুই সদস্য নাঈম আহমেদ ও আনোয়ারকে বিস্ফোরকসহ গ্রেফতার করা হয়। নব্য জেএমবির এই জঙ্গিদের পরিকল্পনা ছিল গাড়ি বোমা হামলার। কিন্তু তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় হামলা চালাতে পারেনি। ইউরোপের ন্যায়ে বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে জঙ্গিরা গাড়ি হামলার পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ নিয়েছিল তারা। মনিরুল আরও জানান, আনোয়ার সাভারের হেমায়েতপুরের একটি মোটর গ্যারেজের মালিক। ২০১৫ সালে জেএমবির কথিত একজন মাস্টারের মাধ্যমে সে নব্য জেএমবির সাংগঠনিক দাওয়াত পায়। তখন থেকেই আনোয়ার এর সঙ্গে যুক্ত। মূলত সে ছদ্দবেশী জঙ্গি। গ্রেফতার আনোয়ার নব্য জেএমবির শূরা সদস্যদের পরামর্শে গাড়ি হামলার জন্য নিজের গ্যারেজে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। হলি আর্টিজানের হামলার আগে ওই গাড়ি হামলার জন্য ড্রাইভিং এবং গাড়িবোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে হলি আর্টিজানের হামলার পর পুলিশ যে অভিযানগুলো চালিয়েছে এতে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের পক্ষে হামলা চালানো সম্ভব হয়নি। আনোয়ার নব্য জেএমবির সাভার অঞ্চলের প্রধান আশ্রয়দাতা ছিল। গ্যারেজে কাজ করার পাশাপাশি মাঝে মাঝে সে নব্য জেএমবির সাংগঠনিক কাজ এবং অর্থের জোগানও দিত। তার সঙ্গে জেএমবির সায়োরার জাহান, রিপন, নোমান, আল বানি ও ডন নামে একাধিক জঙ্গির যোগাযোগ আছে। এ ছাড়া নাঈম আহমেদ ২০১৫ সালে বাসারুজ্জামান ওরফে চকলেটের সঙ্গে একটি বেসরকারি আইটি কোম্পানিতে চাকরি করেছে। সেখান থেকেই তারা একসঙ্গে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। র‌্যাব সূত্র বলছে, টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার মসিন্দা গ্রামে মৃত সৈয়দ আবুল হাসান চিশতি নামে এক পীরের দুই ছেলে ড্রোনসহ গ্রেফতার নুরুল হুদা মাসুম (৩০) ও মাজহারুল ইসলাম খোকন (২৮)। গ্রেফতারের পর তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দারুস্সালামের জঙ্গি আবদুল্লাহর আস্তানার বিষয়টি নিশ্চিত হয় র‌্যাব। সূত্র আরও জানায়, মাসুম সাংগঠনিকভাবে উফফে জামানা নামে পরিচিত। তার ছোট ভাই খোকন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি পাস করেছে। খোকন তার বড় ভাই মাসুমকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে একটি ড্রোন তৈরি করছিল। ড্রোন দিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে নাশকতার পরিকল্পনা ছিল তাদের। র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান বলেন, আমাদের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং জঙ্গিবিরোধী সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। টাঙ্গাইলে গ্রেফতার দুই সহোদরকে আমরা আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করব। র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল ইফতেখারুল মাবুদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হিযবুত তাহিররের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত রবিন। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

র‌্যাব সূত্র বলছে, রবিন ২০০৯ সালে ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হয়। এ সময় তার পূর্বের ব্যাচের ছাত্র জাকারিয়ার সান্নিধ্যে আসে এবং ধীরে ধীরে তার হাত ধরে ধর্মীয় উগ্রপন্থায় জড়ায়। একপর্যায়ে রবিন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের প্রাথমিক সদস্য পদ লাভ করে। সংগঠনের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্য তার নিজ এলাকা লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে যায় এবং জাকারিয়ার নির্দেশে বিভিন্ন সময় ঢাকায় এসে অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করত।

সম্প্রতি ঢাকায় এসে শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোহাম্মদপুর বায়তুস সালাম জামে মসজিদের সামনে বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার লক্ষ্যে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীর উলাইয়া বাংলাদেশের সমর্থন, সদস্যপদ গ্রহণ, অন্যকেও সংগঠনে যোগদানের জন্য আহ্বান এবং রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য লেখা লিফলেট বিতরণ করার সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় সস্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে।

সুত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

শেয়ার / প্রিন্ট করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *