টাইগারদের ঐতিহাসিক জয়

আগেরদিন সাকিবের স্ত্রী তাকে বলেছিলেন, ‘পারলে তুমিই জেতাতে পারবা।’ আর তামিম ইকবাল কী বলেছিলেন, মনে আছে তো? ওয়ার্নার-স্মিথ জুটি ভাঙলেই পরপর ওদের উইকেট পড়বে। ঠিক তা-ই হল। সেই জুটি ভাঙতেই বাংলাদেশ ফিরল ম্যাচে। শুধু কি ফিরল? স্পিন-বিষে অসিদের নীল করে তুলে নিল এক ঐতিহাসিক জয়। আগের চার ম্যাচে যে জয় ছিল অধরা, তা প্রথম ধরা দিল মিরপুরে। তাইজুলের বলে হ্যাজলউড লেগ-বিফোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেরেবাংলার গ্যালারিতে যৌবন-গর্জন। বুধবারের দুপুর তখন নূপুর পায়ে আনন্দ-নৃত্যে বিভোর। উল্লাসের প্রজাপতি উড়ল শেরেবাংলায়। লাল-সবুজের উজ্জ্বল সূর্যের নিচে গোটা বাংলাদেশ তখন গাইছে- ‘আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে…।

এই যে শুধু ২০ রানের জয়, চারদিনেই অস্ট্রেলিয়ার অহংকার দুমড়ে-মুচড়ে দেয়াও নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। গেল ১২ মাসে সাফল্যের সমুদ্রে বাংলাদেশের ক্রিকেট-তরী ভেসেই চলেছে। হেসেই চলেছেন সাকিব-তামিমরা। সেই হাসি আরও চওড়া হল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অবিস্মরণীয় জয়ে। ম্যাচ শেষে পরিতৃপ্ত এক দর্শক বলছিলেন, ‘এবার বুঝেছি অস্ট্রেলিয়া কেন আসতে চাইছিল না।’ স্মিথ-ওয়ার্নাররাও হয়তো ভাবছেন, ‘কাল তো ছিলাম ভালো, আজ আমার কী হল…।’

যেটা হল, সেটা খুবই স্বাভাবিক। টাইগারদের শক্তি টের পেয়েছে ইংল্যান্ড। এবার পেল অস্ট্রেলিয়া। ১১ বছর আগে ফতুল্লায় রিকি পন্টিংদের কানের কাছ থেকে চলে গিয়েছিল গুলি। কাল মিরপুরে স্মিথদের বুকে বিঁধল স্পিন-শেল! সাকিব, মিরাজ, তাইজুলের স্পিনে ক্ষতবিক্ষত ওয়ার্নাররা। দেশবাসীকে ঈদের সেরা উপহারটি দিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট-বীরেরা। ঐতিহাসিক এ জয়ের নায়ক সাকিব। ক্যারিয়ারের ৫০তম টেস্টে ব্যাট হাতে প্রথম ইনিংসে ৮৪ রান করার পর বোলিংয়ে দুই ইনিংসেই পাঁচটি করে উইকেট নিয়েছেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। তৃতীয় উইকেটে ওয়ার্নার ও স্মিথের ১৩০ রানের জুটিতে অস্ট্রেলিয়া যখন জয় দেখছিল, তখনই সাকিবের স্পিনে ঘুরে যায় ম্যাচের মোড়। উপমহাদেশে প্রথম সেঞ্চুরি পাওয়া ওয়ার্নারকে ১১২ রানে ফেরানোর পর স্মিথকেও ৩৭ রানে তুলে নেন সাকিব। শেষদিকে কামিন্স ও নাথান লায়ন চোয়ালবদ্ধ লড়াই করলেও সেই ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেননি অতিথিরা। ২৬৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় সাকিবের ঘূর্ণি-জাদুতে মাত্র ৮৬ রানে শেষ আট উইকেট হারিয়ে ২৪৪ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। ১০১ টেস্টে এটি বাংলাদেশের দশম জয়। মাঠে এসে ঐতিহাসিক এ জয়ের সাক্ষী হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ৃস্নায়ুযুদ্ধের ঘোষণা আগের দিনই দিয়ে রেখেছিলেন স্মিথ-সাকিবরা। দু’দলের খেলোয়াড়রাই এগিয়ে রেখেছিলেন নিজেদের। সবাই জানতেন, আসল পরীক্ষাটা দিতে হবে মাঠেই। কাল ম্যাচের চতুর্থদিনে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল ১৫৬ রান, বাংলাদেশের আট উইকেট। বড় দলের বিপক্ষে মাঝারি লক্ষ্য দিয়ে এমন অবস্থায় খেই হারিয়ে ফেলার উদাহরণ অনেকই রয়েছে। ২০০৪ সালে মুলতান টেস্ট, ২০০৬ সালে ফতুল্লা টেস্ট তারই উদাহরণ। ম্যাচের চাপ সামলানোটা বাংলাদেশ মিরপুর থেকেই শিখেছে, গত বছর ইংল্যান্ডকে তিন দিনে হারিয়ে। দেশের বাইরে নিজেদের শততম টেস্টে শ্রীলংকাকে হারানোর পর আত্মবিশ্বাসটা আরও বেড়েছে। স্নায়ুযুদ্ধ আর চাপ জয় করে মিরপুরে আরও একটি ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। ১১ বছর পর টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হয়ে ২০ রানের জয় তুলে নিল টাইগাররা। ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড ছাড়া বাকি পাঁচটি টেস্টখেলুড়ে দলের বিপক্ষেই জেতা হয়ে গেল টাইগারদের।

সিরিজের আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাকিবের ২-০তে জেতার ঘোষণাটা রূপকথাই মনে হয়েছিল স্টিভেন স্মিথের কাছে। বাংলাদেশের অতীত পারফরম্যান্স টেনে এনে উপহাস করে খোঁচা দিতেও ছাড়েননি অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক। ম্যাচ শেষে সাকিব জানালেন, এ জয়েই হয়তো কড়া জবাব দেয়া গেছে স্মিথকে। সাকিব বলেন, ‘ম্যাচটা জেতা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

আগের ওভারেই নাথান লায়নকে আউট করে নবম উইকেট তুলে নিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। অস্ট্রেলিয়ার স্কোর তখন ২২৮/৯! জয়ের জন্য প্রয়োজন ৩৭ রান। যেখানে মুড়িমুড়কির মতো উইকেট পড়ছে, সেখানে শেষ উইকেটে ৩৭ রান তো অকল্পনীয়। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জয় দেখতে প্রেসিডেন্ট বক্সে হাজির হয়েছেন। আগেরদিনও আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দিনের খেলা প্রায় শেষদিকে থাকায় প্রধানমন্ত্রীকে মানা করা হয়েছিল। কাল এমন সময়ই সবার কপালে ভাঁজ ফেলে দিলেন মিরাজ। ১৯ বছর বয়সী এই স্পিনার নিজের ১৯তম ওভারে দিলেন ১৫ রান। ড্রেসিংরুমের মধ্যে থেকেও হয়তো ঘামছিলেন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। রুম থেকে বেরিয়ে এসে একা ড্রেসিংরুমের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। একটু এদিক-ওদিক হলেই সব আশা শেষ হয়ে যাবে। এ টেস্টে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছেন প্যাট কামিন্স। সেটা ব্যাটে-বলে দুই বিভাগেই। সেই কামিন্সই তখন শেষ ঝাঁকুনি দিলেন ৩৩* করে। জয় থেকে অস্ট্রেলিয়া ২১ রান দূরে। পাঁচ উইকেটের সঙ্গে দলকে উজ্জীবিত করে রাখা সাকিব ম্যাচের লাগাম নিজেদের হাতে আনলেও পার্শ্বনায়ক তাইজুল ইসলাম। দারুণ সব স্পেল আর ব্রেক থ্র“তে কাজটা সহজ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের ফিনিশিংটাও এলো তার হাত ধরে। হ্যাজলউডকে এলবিডব্ল–র ফাঁদে ফেলে ম্যাচ শেষ করে দিলেন তাইজুল। বাংলাদেশের আরেকটি মহাকাব্যিক জয় দেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রেসিডেন্ট বক্স থেকে লাল-সবুজের পতাকা উড়াতে লাগলেন।

আগের রাত থেকে ক্রিকেটবিশ্বে আলোচনা হচ্ছে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয় নিয়ে। প্রায় অসম্ভকে সম্ভব করে ফেলেছে ভঙ্গুর ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে বাংলাদেশের জন্য জয়টা কখনোই অসম্ভব মনে হয়নি। এশিয়ায় দুইশ’ রানের বেশি তাড়া করে অস্ট্রেলিয়া এর আগে একবারই জয় পেয়েছে। সেটাও ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে। ১১ বছর পর সেই বাংলাদেশের বিপক্ষে ২৬৫ রান তাড়া করতে নেমে আবার আশা জাগিয়েছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার। আগেরদিনের ৭৫* রান নিয়ে খেলতে নেমে কাল সেটা সেঞ্চুরিতে নিয়ে গেছেন। অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক মিলে ১৩০ রানের জুটিও গড়ে ফেলেছেন। সাকিব ওয়ার্নারকে আউট করার পরই ম্যাচে ফেরে স্বাগতিকরা। বাকিটা সময় প্যাট কামিন্সই যা একটু চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল।

অসাধারণ জয়ে বাংলাদেশ দলকে দুই কোটি টাকা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিসিবি। মাঠকর্মীরাও পাচ্ছেন বোনাস। তাদের দেয়া হয়েছে তিন লাখ টাকা। আগামীকাল চট্টগ্রামে যাবে বাংলাদেশ দল। বিসিবির দল ঘোষণায় অপরিবর্তিত রয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচের স্কোয়াড। ৪ সেপ্টেম্বর জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে শুরু হবে দ্বিতীয় টেস্ট। সেখানেও অস্ট্রেলিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে স্পিনিং উইকেট। বাংলাদেশ এখন ২-০তে সিরিজ জয়ের অপেক্ষায়।
সুত্র :যুগান্তর

শেয়ার / প্রিন্ট করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *