জীবন যেখানে যেমনঃ আবু আহম্মদ আল মামুন, এসএসপি, আরএমপি

জীবন যেখানে যেমনঃ
Life is not a bed of Roses.
সকাল থেকেই এসএসসি পরীক্ষা শুরু। পরীক্ষার কথা শুনলেই সাইকোলজিকাল ইফেক্ট পড়ে না এমন মানুষ কম। তবে এখনকার মতো ডজন ডজন পরীক্ষা দেওয়ার রেওয়াজ আগে থাকলে আমরাও হয়তো পরীক্ষার ডর করতাম না। পরীক্ষা কেন্দ্রের পুলিশি নিরাপত্তা প্রোগ্রাম সাইন করতে গিয়েই নস্টালজিক হয়ে এ লেখা।

যা হোক,
1990 সালের কথা, পরীক্ষার জন্য গ্রামের স্কুল ছেড়ে প্রায় 14/15 কিমি দূরে শহরের পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে হবে।

শহরে এসে থেকে
পরীক্ষা দিব তেমন আত্মীয়ের বাসা না থাকায় বাবা বললেন, “দেখি আমার এক সহকর্মী (বাবার সাথে শিক্ষকতা করতেন, সে সময় আমাদের বাড়ীতেও অনেকবার এসেছিলেন, এখন গরিবী পেশা ছেড়ে শহরের মানুষ শহরেই বড় ব্যবসা করছেন) তাঁর বাসায় তুলে দেয়া যায় কিনা, তাঁকে কয়েকদিন আগে বলে রেখেছিলাম। তবে আগে গিয়ে মানুষের বাসায় ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কি। আমারও পরীক্ষার ডিউটি আছে। প্রথম পরীক্ষার দিন সকালে আমি সাইকেলে করে তোমাকে নিয়ে যাবো, পরে তাঁর বাসায় তুলে দিব।

দুই বেলা
পরীক্ষার পর পড়ন্ত বিকেলে ঐ আঙ্কেলের বাসায় বাবা নিয়ে গেলেন। মজার বিষয় আঙ্কেল আন্টিকে বলেননি, মনে হয় বলার সাহস পাননি।

আন্টির মেজাজ দেখে ভয় পেয়ে
আমি বাবাকে বললাম, বাবা চল বাড়ি থেকে এসে এসে পরীক্ষা দিব। তখন আঙ্কেল বললেন, বাবা থামো তোমার থাকার ব্যবস্থা করছি। আমাকে ডেকে পাশে নিয়ে গেলেন এক নির্মাণাধীন বাড়ীর টিনের চালার একটি রুমে। সেখানে পলাশ চন্দ্র নামের ক্লাস ফোরের একটি ছেলে ও তার কলেজ পড়ুয়া বড় ভাই এর ক্ষণস্থায়ী রুমমেট হলাম।

পলাশের বড় ভাই ছোট ছোট টিউশনি করে, এ দিয়ে দুই ভাই লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যায়। জানলাম পলাশেরা নির্মাণাধীন ভবনের মালিকের গ্রামের প্রতিবেশি, এখানে মালামালের পাহারাদার তারা।

থাকার ঘরে
সিমেন্টের খালি বস্তা ও রাজমিস্ত্রীর যন্ত্রপাতি। প্রথমে মন খারাপ হলেও ভাবলাম, পরীক্ষা তো দিতেই হবে, অগত্যা বাবাও বললেন, যা পড়ার তা তো হয়েছে, পরীক্ষা চালিয়ে যাও বাবা, আর এ টাকা দিলাম মায়া সিনেমা হলের কাছে হোটেলে থেকে খেয়ে আসবে। বাবা এ বলে চলে গেলেন।

থাকার রুমে
একটা টং খাটিয়া, দুই ভাই এক সাথে থাকে ও নিজেরাই রান্না করে খায়। এবার মেঝেতে সিমেন্টের বস্তা বিছিয়ে বাড়ী থেকে আনা চাদর দিয়ে বিছানা করলাম। পলাশ চন্দ্রের বড় ভাই টিউশনিতে গেছে। এবার বেষ্ট ফ্রেন্ড পলাশ, কারণ এ যাত্রায় ধরণীতে তরণী সে।

বসে আড্ডা দিয়ে
ওর পড়া, অঙ্ক বুঝিয়ে দিয়ে হাত করে নিলাম। পরে রাতে খাটিয়ায় ভাই এর সাথে না থেকে পলাশ মেঝেতে আমার সাথেই ঘুমালো। এতটুকু ছেলের মানবীয় উপলব্ধি ও বন্ধুত্ব আমাকে নতুন করে উদ্দীপনা যোগালো। আসলে বিধাতা সুগন্ধ, সত্য, সুন্দর, সুকুমার প্রবৃত্তি গুলো বিত্ত, বয়স, ধর্ম দেখে মানুষকে দেয় না। এ ঈশ্বর ঐ ভদ্র পল্লীতে না থেকে শিশুপল্লীতেও থাকতে পারে।

চলছে পরীক্ষা,
কয়েকটি পরীক্ষার পর একদিন মুষল ধারে বৃষ্টি হলো। সন্ধ্যার পর হ্যারিকেনের আলোয় মেঝেতে বিছানায় পড়ছি এমন সময় (স্যাতস্যাতে পরিবেশ) পিছনে কিছু নড়াচড়ার মতো অনুভূত হচ্ছিল। হাত পিছনে দিতেই কাটার আঘাত লাগে। চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠি, পলাশ বাহির হতে দৌড়ে আসে। দুই জন মিলে খুঁজি। ভেবেছিলাম সাপ, দেখি বিশাল একটি দেশি কই মাছ।

পলাশ বলল,
বৃষ্টি হওয়াতে পাশের পুকুর হতে উঠে এসেছে এটি। পলাশ কই মাছটি আমার জন্যই রান্না করে বলেছিল ভাইয়া আজ হোটেলে যেতে হবেনা। আজ আপনি আমার মেহমান।

পুনশ্চঃ
আমার এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট জানার পর ঐ আঙ্কেল খুব খুশি হয়েছিলেন। বাসায় আসার জন্য বলেছিলেন, কিন্ত্ত আমি রাগ করে দেখা করিনি। এখন একবার হলেও জানতে ইচ্ছা করে … বেশি জানতে ইচ্ছা করে সুন্দর মানবিক ছোট্ট পলাশ কি করছে কোথায় আছে। মনে পড়ে ছোটন, কল্লোলসহ ওর বন্ধুদের কথাও, ওরা এসে এখানে খেলতো। ওরা সবাই আমার সময়ের নিষ্পাপ বন্ধু ছিল।

শেয়ার / প্রিন্ট করুনঃ

2 Comments

  1. প্রত্যেকের সফলতার পেছনে কোন না কোন কষ্টের পরিশ্রমের, অধ্যাবসায়ের গল্প থাকে । আপনার সফলতার পেছনের গল্পগুলোর মধ্যে
    এইটি পড়ে বেশ ভাল লাগল । আপনার দীর্ঘায়ু কামনা রইল ।

  2. শ্রদ্ধেয় স্যার,
    আপনার অতীতের গল্পটা পড়ে খুব ভাল লাগল। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন ঘটনা বহুল অনেক স্মৃতি ইতিহাস হয়ে আছে। যারা কষ্টের এইসব ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছে তারা জীবনে সফল হয়েছে আপনার মত। আপনার উত্তর উত্তর সফলতা কামনায় —-

    মোঃ সামসুজ্জামান
    এএসআই(নিঃ)
    কেন্দ্রীয় রিজার্ভ অফিস
    আরএমপি, রাজশাহী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *